Bangla Beyond Feature
সফলতার গল্পগুলো আমরা প্রায়ই দেখি। কিন্তু খুব কম মানুষই সেই গল্পের শুরুর অংশটা দেখে—যেখানে থাকে অনিশ্চয়তা, একাকীত্ব, ক্লান্তি আর অসংখ্য অদৃশ্য সংগ্রাম।
অস্ট্রেলিয়ার এডেলেইডে জনপ্রিয় রেস্টুরেন্ট Mum’s Kitchen-এর নতুন মালিক হৃদয় শিকদারকে আজ যারা দেখেন, তারা হয়তো একজন আত্মবিশ্বাসী উদ্যোক্তাকেই দেখেন। কিন্তু এই অবস্থানে পৌঁছানোর আগে তার জীবনের অনেকগুলো বছর কেটেছে বিদেশের মাটিতে কঠোর পরিশ্রম, আত্মত্যাগ এবং নিজেকে বারবার নতুন করে গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে।
হৃদয়ের জন্ম বাংলাদেশের মুন্সিগঞ্জ জেলার টংগিবাড়ী উপজেলায়। ছোটবেলা থেকেই তিনি বিশ্বাস করতেন, জীবনে বড় কিছু করতে হলে নিজের পরিচিত গণ্ডির বাইরে বের হতে হবে। সেই বিশ্বাস থেকেই ২০১৭ সালে উচ্চশিক্ষার উদ্দেশ্যে দক্ষিণ কোরিয়ায় পাড়ি জমান। নতুন দেশ। নতুন ভাষা। নতুন সংস্কৃতি। অনেকের কাছে বিদেশে পড়তে যাওয়া একটি স্বপ্নের মতো মনে হলেও, বাস্তবতা ছিল ভিন্ন। বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্লাস, টিউশন ফি, বাসাভাড়া, দৈনন্দিন খরচ—সবকিছু সামলাতে গিয়ে খুব দ্রুতই তিনি বুঝতে পারেন, শুধু স্বপ্ন থাকলেই হবে না; সেই স্বপ্নকে বাঁচিয়ে রাখতে হলে কঠোর পরিশ্রমও করতে হবে।
তাই পড়াশোনার পাশাপাশি কাজ শুরু করেন একটি রেস্টুরেন্টে। তার প্রথম দায়িত্ব ছিল ডিশ ওয়াশিং। প্রতিদিন ক্লাস শেষ করে রেস্টুরেন্টে ছুটে যাওয়া, ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে কাজ করা, গভীর রাতে বাসায় ফিরে আবার পড়াশোনা—এটাই হয়ে ওঠে তার নিয়মিত জীবন। অনেকেই হয়তো সেই কাজকে ছোট মনে করতেন। কিন্তু হৃদয় কখনো করেননি। বরং তিনি রান্নাঘরটাকে নিজের ভবিষ্যতের ক্লাসরুম বানিয়ে ফেলেছিলেন।
প্লেট ধোয়ার ফাঁকে ফাঁকে তিনি দেখতেন খাবার কীভাবে প্রস্তুত হয়, একটি রেস্টুরেন্ট কীভাবে পরিচালিত হয়, গ্রাহকদের সঙ্গে কীভাবে আচরণ করা হয়। তিনি শুধু কাজ করছিলেন না, শিখছিলেন। আর সেই শেখার আগ্রহই একসময় তার জীবন বদলে দেয়। ধীরে ধীরে রান্নাঘরের বিভিন্ন দায়িত্ব পান। এরপর কিচেন অপারেশন, স্টাফ ম্যানেজমেন্ট এবং খাবারের মান নিয়ন্ত্রণের মতো গুরুত্বপূর্ণ কাজেও যুক্ত হন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তিনি দক্ষিণ কোরিয়ার বুসান শহরের কয়েকটি জনপ্রিয় রেস্টুরেন্টে ম্যানেজার ও হেড শেফ হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সুযোগ পান।
সেখানেই তিনি উপলব্ধি করেন, খাবার শুধু একটি পণ্য নয়; এটি মানুষকে, সংস্কৃতিকে এবং গল্পকে একসঙ্গে যুক্ত করার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। ২০২১ সালে তিনি নিজের জীবনের সবচেয়ে সাহসী সিদ্ধান্তগুলোর একটি নেন। মাস্টার্স অধ্যয়নরত অবস্থায় বুসানে প্রতিষ্ঠা করেন নিজের প্রথম বাংলাদেশি রেস্টুরেন্ট। বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের খাবার পরিবেশন করা ছিল শুধু ব্যবসা নয়; এটি ছিল নিজের শেকড়কে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার একটি প্রয়াস। সেই অভিজ্ঞতা তাকে নতুন আত্মবিশ্বাস দেয়।
তিনি বুঝতে পারেন, একদিন আন্তর্জাতিক মানের একটি ফুড ব্র্যান্ড গড়ে তোলা সম্ভব। কিন্তু জীবন তাকে আরও বড় একটি পরীক্ষার সামনে দাঁড় করায়। কোভিড-পরবর্তী সময়ে তিনি অস্ট্রেলিয়ায় আসেন। আবারও নতুন দেশ। আবারও নতুন পরিবেশ। আবারও শূন্য থেকে শুরু। অনেকেই হয়তো এখানে এসে একটি নিরাপদ চাকরি খুঁজে নিতেন। কিন্তু হৃদয়ের লক্ষ্য ছিল ভিন্ন। তিনি জানতেন, একদিন নিজের ব্যবসা দাঁড় করাতে হবে। তাই তিনি তাড়াহুড়ো করেননি।
অস্ট্রেলিয়ার হসপিটালিটি ইন্ডাস্ট্রিকে বুঝেছেন। বিভিন্ন পেশাদার কুকিং ও হসপিটালিটি কোর্স সম্পন্ন করেছেন। স্থানীয় গ্রাহকদের চাহিদা, খাদ্য নিরাপত্তা, ব্যবসায়িক সংস্কৃতি—সবকিছু শিখেছেন ধৈর্য নিয়ে। এই প্রস্তুতির ফল আসে ২০২৬ সালে।
এডেলেইডের পরিচিত রেস্টুরেন্ট Mum’s Kitchen-এর দায়িত্ব গ্রহণ করেন তিনি।

সাত বছর ধরে পরিচালিত একটি প্রতিষ্ঠিত রেস্টুরেন্টকে নতুনভাবে সাজানো ছিল সহজ কাজ নয়। কিন্তু হৃদয় এটিকে শুধুমাত্র একটি ব্যবসা হিসেবে দেখেননি।
তিনি এটিকে নিজের স্বপ্নের সম্প্রসারণ হিসেবে দেখেছেন। রেস্টুরেন্টে যুক্ত করেছেন হালাল ফুড কনসেপ্ট। তৈরি করেছেন এমন একটি মেন্যু, যেখানে কোরিয়ান এবং বাংলাদেশি খাবার একই ছাদের নিচে আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখে পরিবেশন করা হয়। তার লক্ষ্য পরিষ্কার—খাবারের মাধ্যমে মানুষের মধ্যে সংস্কৃতির সেতুবন্ধন তৈরি করা। আজ Mum’s Kitchen-এ স্থানীয় অস্ট্রেলিয়ান, বাংলাদেশি, কোরিয়ানসহ বিভিন্ন দেশের মানুষ আসেন। কেউ নতুন স্বাদ খুঁজতে, কেউ পরিচিত স্বাদ ফিরে পেতে, আবার কেউ ভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হতে।
হৃদয়ের কাছে এই রেস্টুরেন্ট শুধু একটি ব্যবসা নয়। এটি তার দীর্ঘ পথচলার প্রতিচ্ছবি। ডিশ ওয়াশিংয়ের কাজ দিয়ে শুরু করা একজন আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী থেকে সফল উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প।
তিনি বলেন,
“আমি বিশ্বাস করি, কোনো কাজই ছোট নয়। আমি যদি সেই সময় ডিশ ওয়াশিংয়ের কাজকে ছোট মনে করতাম, তাহলে হয়তো আজকের এই জায়গায় পৌঁছাতে পারতাম না। জীবনের প্রতিটি অভিজ্ঞতাই আমাকে কিছু না কিছু শিখিয়েছে।”
নিজের সফলতার পেছনে সবচেয়ে বড় অবদান হিসেবে তিনি পরিবার এবং আল্লাহর রহমতের কথা উল্লেখ করেন। কঠিন সময়গুলোতে পরিবারই তাকে মানসিক শক্তি দিয়েছে, আর বিশ্বাস তাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছে। ভবিষ্যতে তিনি Mum’s Kitchen-কে এডেলেইডের অন্যতম পরিচিত হালাল কোরিয়ান ও বাংলাদেশি ফুড ব্র্যান্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চান। তবে তার গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়তো ব্যবসা নয়।
বরং সেই শিক্ষা, যা তিনি নতুন প্রজন্মের প্রবাসীদের দিতে চান। “দ্রুত সফল হওয়ার চেষ্টা করবেন না। শেখার চেষ্টা করুন। ধৈর্য ধরুন। নিজের কাজকে সম্মান করুন। কারণ অনেক সময় জীবনের সবচেয়ে বড় সুযোগগুলো আসে সবচেয়ে ছোট কাজের মধ্য দিয়েই।” মুন্সিগঞ্জের টংগিবাড়ী থেকে দক্ষিণ কোরিয়া, আর সেখান থেকে অস্ট্রেলিয়া—হৃদয় শিকদারের এই যাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, স্বপ্ন পূরণ হয় একদিনে নয়।
কিন্তু যারা প্রতিদিন একটু একটু করে নিজেদের গড়ে তোলে, তারাই একদিন এমন জায়গায় পৌঁছে যায়, যেখানে ফিরে তাকালে সংগ্রামের প্রতিটি মুহূর্তই সার্থক মনে হয়।












